My Master Bengali

My Master (Bengali)

গৌতম বুদ্ধ তাঁর আলোকপ্রাপ্তির সাতদিন পর ঠিক করলেন তাঁর পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করে তাঁর অনুভূতির কথা বলবেন। তাই লোকশিক্ষার্থে তিনি বুদ্ধ গয়া থেকে সারনাথের দিকে রওনা দিলেন। এই যাত্রায় প্রথম তাঁর দেখা হল একটি দিগম্বর সাধু উপকার সাথে। উপকা দূর থেকে দেখলেন এক জ্যোর্তিময় পুরুষের আবির্ভাব। তাঁকে প্রশ্ন করলেন "আপনি কি উপদেবতা?" বুদ্ধ শান্ত স্নিগ্ধ ভাবে উত্তর দিলেন "না"। অবাক হয়ে উপকা জিজ্ঞাসা করলেন "তাহলে কি গন্ধর্ব ?" স্মিত হাস্য মুখে জবাব এল "না"। নিজের মনেই খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে উপকা বললেন "তাহলে আপনি নিশ্চই দেবতা।" আবারও উত্তর এল "না"। হতবাক হয়ে বিষ্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করলেন "তাহলে আপনি মানুষ?" সকরুণ উত্তর এল "না"। এবার উপকা পড়লেন বিপদে। তাঁর সমস্ত যুক্তি তর্ক, চিন্তার উর্দ্ধে তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন কে তবে ইনি? না দেবতা, না উপদেবতা না গন্ধর্ব না মানুষ। ব্যাকুল উপকা জানতে চাইলেন "তবে কে আপনি?" জবাব পেলেন "আমি বুদ্ধ"।

বুদ্ধদেব নিজেই বলেছেন বুদ্ধ কোন মানুষ নয় একটি সত্তা,আলোকপ্রাপ্ত নির্গুন মনের অবস্থা। আমরা মানুষ সংস্কার গতভাবে এই আলোক প্রাপ্ত মানুষকে আমাদের সীমিত চেতনার স্তরে বিচার করে বলি ইনি হয় মানুষ না হয় দেবতা। কিন্তু এই আলোকপ্রাপ্ত অবস্থা কি তা বুঝতে গেলে আমাদের নিজেদের মধ্যে বুদ্ধত্বর সুপ্ত বীজকে যোগ সাধনার দ্বারা জাগ্রত করতে হবে। তখনই হয়ত নিজে অনুভব করব বুদ্ধত্ত্ব কি।

ছোটবেলা থেকে দেখেছি, আমার মা ছিলেন ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের ভক্ত। তার সাথেই বেলুড় মঠে যাতায়াত আর অনেক বড় সন্ন্যাসীদের সাথে আলাপ। অল্প বয়েসেই মাকে হারালাম আর তার সাথে কাটল বেলুড় মঠের যোগাযোগ। ঈশ্বর কে, বুদ্ধ কে কোনরকম মাথা ব্যাথা ছিলনা আমার। এই ক্ষুদ্র, অহংকারময় "আমি", ঠাকুরের ভাষায় 'কাঁচা আমিকে' নিয়ে ভালই ব্যাস্ত ছিলাম। সংসার-কর্ম জীবণ এর বাইরে দেখার বা ভাবার চেষ্টাও করিনি। এটাকে ঈশ্বরের কৃপাই বলব কর্ম জীবনে এল এক বড় ঝড়, থমকে গেল কর্ম জীবণ। জীবণ দর্শণের ধারণাই গেল বদলে। জীবনকে নতুন ভাবে সমীক্ষা করার চেষ্টা করলাম। এমন সময় হাতে এল পরমহংস যোগানন্দের লেখা "Autobiography of a Yogi"। এটাই অদৃষ্ট তাই আচার্য সুধীন রায়ের কাছে পৌঁছে গেলাম ক্রিয়া নিতে।

যখন আমি তাঁর কাছে পৌঁছই আমি জানতাম না যে আমার গুরুদেবের দর্শণ পাব।ভাব ছিল ক্রিয়া শিখতে যাচ্ছি। একজন শিক্ষক আর গুরুর মধ্যে জমীন আসমান ফারাক। যখন আমি ক্রিয়া পেলাম মনে হল আমি ভেসে গেলাম। সব যুক্তি তর্ক চিন্তার বহির্ভুত এ জগত। তিন দিন আমার পাগলের মত অবস্থা ছিল। গৃহে আছি অথচ গৃহে নেই। সদগুরুর কাছে দিক্ষা পেয়ে ভেসে যাওয়ার অনূভুতি এ যেনা পেয়েছে তাকে বোঝানো যাবেনা।

আচার্য সুধীন রায়কে হয়তো আমরা অনেকেই চিনি। কেউবা তাঁর বাল্য বন্ধু, কেউ তাঁর ঘনিষ্ট আত্মীয়, আবার কারুর সাথে তাঁর অল্পদিনের পরিচয়। হয়তো আমরা সুধীন রায় মানুষটাকে চিনি, তিনি কোথায় থাকেন কি তাঁর পচ্ছন্দ বা কি অপচ্ছন্দ ইত্যাদি। এই সবের মধ্যে একটাই প্রশ্ন থেকে যায় সুধীন রায় যিনি আমাদের গুরু তাঁকে কি আমরা চিনেছি? কতটুকুই বা আমরা চেনার ক্ষমতা রাখি? তাঁর সম্পর্কে লিখতে গেলে স্বামীজির কথা ধার করতে হয়। যখনই তাঁকে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ সম্পর্কে বলতে বলা হত তিনি বলতেন "ক্ষেপেছিস নাকি শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর গড়ব নাকি"? আমার গুরুদেবকে মাপা মানে ছোট ফিতে দিয়ে সমুদ্র মাপা। সে ধৃষ্টতা আমি করব না। সুধু কয়কটা ঘটনা উল্লেখ করছি যা তাঁর ব্যাপ্তির একটা অংশ প্রকাশ করে। কিভাবে তাঁর সান্নিধ্যে এসে আমি সম্পূর্ণ ভাবে বদলে গেছি।

শাস্ত্রে বলে যাঁরা বোধিস্বত্ব তাঁরা 'বোধি চিত্ত' বা 'বিশ্ব মনের' সাথে যুক্ত। গুরুদেবের এই বিশ্ব মনের সাথে যুক্ততার একটা ঘটনা উল্লেখ করি। তখন আমি সবে সবে দীক্ষা পেয়ে নিজের যায়গায় ফেরত গিয়ে নিজের অনুভূতির কথা লিখে তাঁকে খুব বড় একটা email করি। উত্তর এল আধ লাইন। খুব অভিমান হল, নিজের মনেই ভাবলাম আমি থাকি এত দূরে আমার জন্য শুধু এইটুকুই? নিজের মনে ঠিক করলাম আর আমার গুরুর দরকার নেই এই পথে আমি একাই চলব। দুই দিন এই মন কষ্টে ভুগেছি। শুক্রবার আমাদের ছুটির দিন ফোন এল । স্বয়ং গুরুদেব ফোন করেছেন বললেন "তোমার email পেয়েছি, আমি সময় পাইনি পরে উত্তর দেব।" আমি বুঝলাম এই সুদুরে থেকে আমার মনের অবস্থা সমস্থটুকুই টের পেয়েছেন। আমি চুপ করেছিলাম তাই বললেন "আমাকে পরীক্ষা করে নিতে হবে তো।"

না তাঁকে কোনদিন আমি পরীক্ষা করিনি। নিজেকে তাঁর পায়ে সর্মপন করেছি। কিন্তু এটা টের পেয়েছি তিনি ভক্তদের ক্রমাগতই পরীক্ষা করেছেন। পরীক্ষার ফলাফল যদিও ঘোষণা করেননা নিজের মধ্যেই রাখেন। তাঁর কৃপাতেই এই অনুভূতি হয়েছে তাঁর নির্মল কায়া হয়ত আমাদের মতনই কিন্তু আসলে তিনি হচ্ছেন শুধু আলো। যত নিজের জীবণ গুরুময় করেছি , ভরে গেছি এই শুদ্ধ পবিত্র আলোতে। আমি একটি সাধারণ মেয়ে অপূর্ণতায় পূর্ণ। তিনি যেন পরশ পাথর। তাঁর ছোঁয়া যে পায় স্বর্ণে পরিনত হয়। তাঁর শিক্ষার ধরণও অদ্ভুত, আমার মনে পড়েনা তিনি কোনদিন বাক-শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর কাছে যতবারই গেছি গল্প করেছি , তর্ক করেছি। আনন্দ পাই তাঁর সাথে তর্ক করতে। বাড়ি ফেরত এসে টের পেয়েছি আমি আরো বেশি পবিত্র হয়েছি। আরো বেশি করে আমার জীবণ ঈশ্বর অভিমুখি হয়েছে।

তিনি শুধু ধর্ম দানই করেন না, করেন সব থেকে উচ্চ দান, তাহল নিজেকে দান। তিনি আর্তদের পাশে সবসময় আছেন। আমার বোন থাকে লন্ডন এ। একটি কঠিন সময়ের মধ্যে যাচ্ছিল। নিজের চাকরি চলে গেল, বাবা অশুস্থ্, মাকেতো অল্প বয়েসেই হারিয়েছে। সেই রাত, ভোলার নয় যে দিনকে ও শুনলো কলকাতায় ওর বাবা প্রবল জ্বরে আচ্ছন্ন এবং বিকার গ্রস্থ। আমার মনে হল সেই রাতে ও বোধহয় পাগল হয়ে যাবে। রাতে ও স্বপ্ন দেখল গুরুদেব ওর মাথায় হাত দিয়ে বলছেন "শান্তি পাও"। ও টের পেল সারা শরীর ওর ঠান্ডা হয়ে গেছে, আরামে ঘুমল সেই রাতে। আমার মামা অর্থাৎ ওর বাবা শুস্থ হয়ে উঠলেন আর দুই মাসের মধ্যেই ও চাকরিও পেয়ে গেল।

এই আধ্যাত্মিক পথ বড় কঠিন পথ। এখানে দূর্বলতার কোন স্থান নেই। সংস্কার গত ভাবে যা আমাদের মধ্যে ভয় আছে তা বাস্তবে আর্বিভাব ঘটে। কথায় আছে 'বলহিনা লভ্যে না আতমান'। আমি প্রকৃতি গত ভাবে কিছুটা দূর্বল, সর্বদাই পরনির্ভর। গুরুদেবের ছোঁয়ায় এসে নিজের মধ্যে শক্তি খুঁজে পেয়েছি, পেয়েছি আত্মনির্ভরতার শক্তি। এই আধ্যাত্মিক পথ কে বলা হয় 'walking on a razor edge'। ক্ষনিকের অসাবধানতায় চিত্ত বিচ্যুতি হবার সম্ভাবনা প্রবল। তাঁর কৃপাই আমার একমাত্র সম্বল। কখনো যদি অন্য পথে গেছি টের পেয়েছি তিনি সঠিক পথে ফিরিয়ে দিয়েছেন। ক্রিয়া করার ফলে রাতে সব ভয়াবহ স্বপ্ন দেখতে আরাম্ভ করলাম। রাতে ঘুম আসতো না। অবশেষে তাঁর শরনাগত হলাম। শুনে তিনি একটি কথাই বললেন "I will control it"। তার পর সত্যই দু:স্বপ্ন আর দেখিনি। অবাক হয়ে গেলাম এত দূরে থাকি আমি, সূদূরে উত্তরপাড়ায় বসে আমার স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করে দিলেন।

এত কথা লিখেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আমিও কি তাকে চিনেছি না চেনবার ক্ষমতা রেখেছি? উপায় একটাই তার শরনাগত হওয়া। একদিন হয়ত বুঝব বুদ্ধ কে। আমার গুরুদেব কে। তাঁর সম্পর্কে একটি কথা যদি বলি, স্বামীজির কথাই ধার করব, 'Love personified.' অর্থাৎ ভালবাসার অমৃত নির্ঝর।

[Inspired from 'who is a Buddha'- by Sangarakhita an European Buddhist monk]

Written / Submitted By: Sudeshna Bannerji & Saurabh Paul, Dubai, UAE